মহাকাশ ও মহাকাশের আবিষ্কারের রহস্য, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও ঐতিহাসিক দিক নিয়ে বিস্তারিত

মহাকাশ ও মহাকাশের আবিষ্কারের রহস্য, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও ঐতিহাসিক দিক নিয়ে বিস্তারিত

আবিষ্কারের প্রধান দিকগুলো:

কেপলার টেলিস্কোপ:২০০৯ সালে উৎক্ষেপণ করা এই টেলিস্কোপের প্রধান কাজ ছিল পৃথিবীর মতো গ্রহের সন্ধান করা।
এটি সূর্যের মতো নক্ষত্রগুলোর চারপাশে ঘূর্ণায়মান গ্রহগুলো শনাক্ত করে।

পদ্ধতি:নাসা ট্রানজিট পদ্ধতি ব্যবহার করেছে, যেখানে নক্ষত্রের সামনে গ্রহটি অতিক্রম করলে তার আলোতে ক্ষণস্থায়ী পরিবর্তন লক্ষ্য করা হয়।
এই তথ্য খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে নতুন গ্রহগুলো শনাক্ত করা হয়েছে।

৭১৫টি গ্রহ আবিষ্কারঃ

নতুন আবিষ্কৃত গ্রহগুলো: এগুলোর অধিকাংশই আমাদের সৌরজগতের বাইরের গ্রহ, যা এক্সোপ্ল্যানেট নামে পরিচিত।
কিছু গ্রহের অবস্থান এমন অঞ্চলে রয়েছে, যাকে গোল্ডিলকস জোন বলা হয়, যেখানে জীবন ধারণের উপযোগী পরিবেশ থাকতে পারে।
এই আবিষ্কারের গুরুত্ব:জীবনের সন্ধান: বিজ্ঞানীরা এখন এই গ্রহগুলোতে পানি এবং প্রাণের অস্তিত্ব অনুসন্ধানের জন্য গবেষণা চালাচ্ছেন।
মহাবিশ্বের বিস্তার: এই আবিষ্কার আমাদের বুঝতে সাহায্য করে যে মহাবিশ্ব কত বিশাল এবং সেখানে আমাদের পরিচিত জগতের বাইরেও আরও অনেক কিছু থাকতে পারে।
প্রযুক্তির উন্নয়ন: কেপলার মিশনের সাফল্য ভবিষ্যতে আরও উন্নত প্রযুক্তি এবং টেলিস্কোপ তৈরি করতে উৎসাহিত করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা নতুন ৭১৫টি গ্রহ আবিষ্কার করেছে। কেপলার টেলিস্কোপের পাঠানো তথ্য খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে নাসা আমাদের সৌরজগতের বাইরের এসব গ্রহের অবস্থান শনাক্ত করেছে।

গ্রহগুলোর ৯৫ শতাংশ আমাদের সৌরজগতের নেপচুন গ্রহের চেয়ে ছোট। নেপচুন ব্যাসের দিক দিয়ে চতুর্থ বৃহত্তম ও ভরের দিক দিয়ে তৃতীয় বৃহত্তম গ্রহ।নতুন গ্রহগুলোর মধ্যে চারটি আমাদের পৃথিবীর ব্যাসার্ধের আড়াই গুণ ছোট এবং এ গ্রহগুলো ‘বসবাসের যোগ্য অঞ্চলে’ তারা তাদের নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করে। এসব গ্রহের নক্ষত্রের চারপাশে পানি তরল অবস্থায় থাকে।

নতুন গ্রহগুলো ৩০৫টি নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করে অর্থাৎ একটি নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করে একাধিক গ্রহ।

এর আগে সৌরজগতের বাইরে ২৪৬টি গ্রহের সন্ধান দিয়েছিল কেপলার টেলিস্কোপ। নতুন ৭১৫টিসহ এ সংখ্যা দাঁড়ালো ৯৬১টিতে।

নাসার অ্যাস্ট্রোফিজিক্স বিভাগের ডগলাস হাজিন বলেছেন, একসঙ্গে এতোগুলো গৃহ আবিষ্কারের কথা আগে কখন ঘোষণা করা হয়নি। দ্বিতীয়ত, আমাদের সৌরজগতের মতো একটি নক্ষত্রকে ঘিরে বহু গ্রহের প্রদক্ষিণ বোঝা যায় গ্রহের প্রদক্ষিণ ব্যবস্থা একই ধরনের।

তিনি আরও বলেছেন, কেপলারের পাঠানো তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নেপচুনের মতো বড় গ্রহ থেকে শুরু করে পৃথিবীর মতো ছোট গ্রহের আধিক্য আমাদের ছায়াপথে রয়েছে।

শত শত আলোক বর্ষ দূরে কনস্টালেইশন লিরার নক্ষত্রগুলোকে প্রদক্ষিণকারী পৃথিবী সদৃশ গ্রহ শনাক্তে ২০০৯ সালে মহাকাশে কেপলার টেলিস্কোপ পাঠায় নাসা।

মহাকাশ (Space) হলো পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের বাইরে বিস্তৃত এক বিশাল শূন্যস্থান যেখানে গ্রহ, নক্ষত্র, উপগ্রহ এবং বিভিন্ন জ্যোতিষ্ক অবস্থান করে। এটি মূলত মহাবিশ্বের সেই অংশ যা কোনো সীমানায় আবদ্ধ নয় এবং যেখানে অভিকর্ষ শক্তি তুলনামূলকভাবে দুর্বল।

মহাকাশের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য:শূন্যতা: মহাকাশে বায়ু বা কোনো প্রকার মাধ্যম নেই। এটি মূলত শূন্যতা দ্বারা পূর্ণ।
তাপমাত্রা: মহাকাশে তাপমাত্রা অত্যন্ত কম, যা প্রায় -২৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা এর কাছাকাছি।
অভিকর্ষের প্রভাব: মহাকাশে অভিকর্ষ শক্তি থাকলেও তা পৃথিবীর তুলনায় অনেক কম।
নক্ষত্র ও গ্রহ: মহাকাশে অসংখ্য নক্ষত্র, গ্রহ, উপগ্রহ, ধূমকেতু এবং গ্যালাক্সি রয়েছে।
আলো ও অন্ধকার: মহাকাশ বেশিরভাগ সময় অন্ধকার থাকে, কারণ সেখানে আলো ছড়ানোর মাধ্যম নেই।
মহাকাশ গবেষণার গুরুত্ব:বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি উন্নয়ন: মহাকাশ গবেষণার মাধ্যমে আমরা নতুন প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের অগ্রগতি অর্জন করি।
জীবনের উৎপত্তি: মহাকাশের বিভিন্ন উপাদান ও পরিবেশ বিশ্লেষণ করে জীবনের উৎপত্তি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
জলবায়ু পরিবর্তন: পৃথিবীর বাইরে থেকে আমাদের গ্রহের জলবায়ু ও আবহাওয়ার পরিবর্তন সম্পর্কে ভালোভাবে বোঝা যায়।
মহাকাশ গবেষণার কিছু উল্লেখযোগ্য মাইলফলক:১৯৫৭ সালে প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ স্পুটনিক ১ উৎক্ষেপণ।
১৯৬৯ সালে নীল আর্মস্ট্রং চাঁদে প্রথম পা রাখেন।
আন্তর্জাতিক মহাকাশ কেন্দ্র (ISS) মহাকাশ গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।

১৯৬৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত মহাকাশ গবেষণার উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলী:

১৯৬৯ আপোলো ১১ মিশন: নীল আর্মস্ট্রং এবং বাজ অলড্রিন চাঁদের মাটিতে প্রথম পা রাখেন। এটি মানবজাতির জন্য একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক।
১৯৭১ প্রথম মহাকাশ স্টেশন: সোভিয়েত ইউনিয়নের সাল্যুট ১ মহাকাশ স্টেশন উৎক্ষেপণ।
১৯৭৭ ভয়েজার মিশন: নাসার ভয়েজার ১ এবং ২ মহাকাশযান সূর্যজগতের বাইরের অংশে অনুসন্ধানের জন্য উৎক্ষেপণ করা হয়।
১৯৮১ স্পেস শাটল প্রোগ্রাম: নাসা প্রথম পুনর্ব্যবহারযোগ্য স্পেস শাটল কোলম্বিয়া উৎক্ষেপণ করে।
১৯৯০ হাবল স্পেস টেলিস্কোপ: মহাকাশে হাবল টেলিস্কোপ স্থাপন করা হয়, যা মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমাদের গভীর অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করে।
২০০০ আন্তর্জাতিক মহাকাশ কেন্দ্র (ISS): প্রথমবারের মতো ISS-এ মানুষ স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে।
২০০৪ স্পেসশিপওয়ান: প্রথম বেসরকারি মহাকাশযান মহাকাশে পৌঁছে।
২০১২ কিউরিওসিটি রোভার: নাসার কিউরিওসিটি রোভার মঙ্গল গ্রহে অবতরণ করে এবং সেখানে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান শুরু করে।
২০২০ স্পেসএক্স ক্রু ড্রাগন: এলন মাস্কের স্পেসএক্স প্রথমবারের মতো বাণিজ্যিকভাবে মানুষ মহাকাশে প্রেরণ করে।
২০২১ জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ: সবচেয়ে শক্তিশালী স্পেস টেলিস্কোপ মহাকাশে উৎক্ষেপণ করা হয়। এটি মহাবিশ্বের প্রাচীন ইতিহাস জানার একটি বড় পদক্ষেপ।
২০২৩ চন্দ্রযান-৩: ভারতের ISRO সফলভাবে চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে একটি ল্যান্ডার স্থাপন করে, যা এই অঞ্চলে প্রথমবারের মতো কোনো মহাকাশযানের অবতরণ।
২০২৪ (প্রত্যাশিত)আর্তেমিস প্রোগ্রাম: নাসার নেতৃত্বে চাঁদে মানুষ পাঠানোর নতুন প্রোগ্রামের অংশ হিসাবে, চাঁদে দীর্ঘমেয়াদী উপস্থিতি প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা।
মঙ্গল মিশন: মঙ্গল গ্রহে মানুষ পাঠানোর প্রচেষ্টার জন্য স্পেসএক্স এবং অন্যান্য সংস্থাগুলোর প্রস্তুতি জোরদার করা হয়েছে।

মিল্কওয়ে গ্যালাক্সি (Milky Way) হলো একটি বিশালাকার সর্পিল ছায়াপথ (Spiral Galaxy) যেখানে আমাদের সৌরজগৎ এবং পৃথিবী অবস্থান করে। এটি অসংখ্য নক্ষত্র, গ্রহ, ধূলিকণা এবং গ্যাস নিয়ে গঠিত।
মিল্কওয়ের বৈশিষ্ট্য:

আকার:মিল্কওয়ের প্রস্থ প্রায় ১ লাখ আলোকবর্ষ।
এর কেন্দ্র থেকে সূর্যের দূরত্ব প্রায় ২৬,০০০ আলোকবর্ষ।

নক্ষত্রের সংখ্যা:এই গ্যালাক্সিতে আনুমানিক ১০০ থেকে ৪০০ বিলিয়ন নক্ষত্র রয়েছে।

গঠন:এটি একটি সর্পিল আকারের ছায়াপথ। এর কেন্দ্রীয় অঞ্চল (Galactic Center) থেকে সর্পিল বাহুগুলো (Spiral Arms) প্রসারিত।
কেন্দ্রস্থলে রয়েছে একটি বিশালাকার ব্ল্যাক হোল, যার নাম সাজিটেরিয়াস A*।

সৌরজগতের অবস্থান:আমাদের সৌরজগৎ মিল্কওয়ের ওরিয়ন বাহু (Orion Arm)-এ অবস্থিত।

ধূলিকণা ও গ্যাস:গ্যালাক্সির বিভিন্ন অংশে ধূলিকণা ও গ্যাসের ঘনত্ব রয়েছে, যা নতুন নক্ষত্র গঠনে সহায়ক।
নামকরণ:মিল্কওয়ের নাম এসেছে প্রাচীন গ্রিক শব্দ গ্যালাক্সিয়াস থেকে, যার অর্থ "দুধের পথ"।
এটি রাতে আকাশে একটি দুধসাদা আলোছটার মতো দেখায়, যা এই নামের কারণ।

মহাবিশ্ব তৈরির রহস্য যেভাবে সন্ধান করছে ইউক্লিড টেলিস্কোপ
ছবির উৎস,TAS
৪ জুলাই ২০২৩

বিজ্ঞানের জগতে সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি – এই মহাবিশ্ব কী দিয়ে তৈরি?

এর উত্তর খুঁজতে ইউরোপীয় একটি টেলিস্কোপ যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা থেকে মহাকাশে উৎক্ষেপণ করা হয়েছে।


এই মিশনের নাম ইউক্লিড যা দূরবর্তী কোটি কোটি গ্যালাক্সির ছবি তুলে এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের একটি নিখুঁত ত্রিমাত্রিক বা থ্রিডি ম্যাপ তৈরি করবে। বিজ্ঞানীরা এই ম্যাপের সাহায্যে কথিত ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জি সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার চেষ্টা করবেন।

ধারণা করা হয় মহাবিশ্বে আমরা যা কিছু দেখি তার সবকিছুর আকার ও বিস্তৃতিকে এই দুটো জিনিসই নিয়ন্ত্রণ করে থাকে।

তবে গবেষকরা স্বীকার করে নিয়েছেন যে এই ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জি সম্পর্কে তারা এখনও পর্যন্ত তেমন কিছুই জানেন না। এর কোনোটি সরাসরি চিহ্নিতও করা যায় না।

এখন এই দুটো বিষয় সম্পর্কে জানতে ইউক্লিডের তৈরি থ্রিডি ম্যাপ ব্যবহার করা হবে। এর সাহায্যে বিজ্ঞানীরা বুঝতে চেষ্টা করবেন ডার্ক এনার্জি ও ডার্ক ম্যাটার মহাবিশ্বের সময় ও স্থানের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলেছে।

যুক্তরাজ্যে ল্যাঙ্কাস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী অধ্যাপক ইসোবেল হুক বলেন, জ্ঞানের এই অভাবের কারণে আমরা আমাদের উৎস সম্পর্কে আসলেই কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারি না।

তিনি বলছেন, এই ইউক্লিড মিশন থেকে যা কিছু জানা যাবে সেগুলো এই মহাবিশ্বকে বুঝতে আমাদের সাহায্য করবে।

“এই মিশন অনেকটা কোথায় স্থলভূমি আছে তা জানার আগে জাহাজে করে যাত্রা করার মতো। এই গবেষণা থেকে জানার চেষ্টা করবো - আমরা এই মহাবিশ্বের কোথায় অবস্থান করছি, কিভাবে আজকের পর্যায়ে এসেছি এবং বিগ ব্যাং মুহূর্তের পর থেকে কিভাবে অপরূপ সব গ্যালাক্সি তৈরি হলো, কিভাবে তৈরি হলো সৌরজগত এবং জন্ম হলো প্রাণের,” - বিবিসিকে বলেন তিনি।আরো পড়তে পারেন:সত্যিই কি মহাবিশ্বে বালুকণার চেয়ে বেশি তারা আছে?২৭ জুলাই ২০১৮

ছবিরউৎস, NASA/ESA/R.MASSEY/CALTECH ছবির ক্যাপশান, হাবল টেলিস্কোপ দিয়ে আকাশের অল্প একটু স্থানে ডার্ক ম্যাটারের উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে।

ইউক্লিড টেলিস্কোপটি তৈরিতে খরচ হয়েছে ১৪০ কোটি ইউরো। স্পেস এক্সের ফ্যালকন-৯ রকেটে করে শনিবার কেপ ক্যানাভেরাল থেকে এটিকে মহাকাশে পাঠানো হয়েছে।

এই টেলিস্কোপটি অবস্থান করবে পৃথিবী থেকে ১৫ লক্ষ কিলোমিটার দূরে। গন্তব্যে গিয়ে পৌঁছাতে এর সময় লাগবে এক মাসের মতো। বিজ্ঞানীরা বলছেন এর সাহায্যে ফিরে যাওয়া যাবে মহাবিশ্বের এক হাজার বছর আগের ইতিহাসে।

পৃথিবীর পাশাপাশি এটিও সূর্যের চারদিকে একই গতিতে প্রদক্ষিণ করবে।

প্রাথমিকভাবে এটি ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা এসার প্রকল্প হলেও এই মিশনে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসারও উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে, বিশেষ করে টেলিস্কোপের বিজ্ঞান ও প্রকৌশলগত বিষয়ে।

ইউক্লিড মহাকাশে কী করবে?

আগে পরিচালিত গবেষণা থেকে ধারণা করা হয় যে মহাবিশ্বে যতো শক্তি আছে তার ৭০% ডার্ক এনার্জি। প্রায় ২৫% আছে ডার্ক ম্যাটার; এবং বাকি ৫% হচ্ছে নক্ষত্র, তারকা, গ্যাস, ধুলোবালি, গ্রহ এবং আমাদের মতো দৃশ্যমান বস্তু।

বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের রহস্যময় এই ৯৫% জগত সম্পর্কে ধারণা পেতেই ইউক্লিড টেলিস্কোপ ছয় বছর ধরে দুটো গবেষণা পরিচালনা করবে।

এর মধ্যে প্রধান কাজ হবে ডার্ক ম্যাটার কোথায় কিভাবে আছে তার একটি মানচিত্র তৈরি করা। এই বস্তুটি সরাসরি চিহ্নিত করা যায় না। কিন্তু জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা মাধ্যাকর্ষণ শক্তির দৃশ্যমান প্রভাবের কারণেই মহাবিশ্বে এরকম ম্যাটারের অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেন।

উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে: এই ম্যাটারের উপস্থিতি না থাকলে গ্যালাক্সিগুলো তাদের আকৃতি ধরে রাখতে পারতো না। এই শক্তি ‘স্ক্যাফল্ডিং’ হিসেবে কাজ করে। এটি অনেকটা অদৃশ্য আঠার মতো যা মহাবিশ্বকে একত্রিত করে রেখেছে। ধারণা করা হয় সেটা যা কিছুই হোক না কেন, এটাই ডার্ক ম্যাটার। এখান থেকে আলো বিচ্ছুরিত হয় না, আলো শুষেও নেয় না, এমনকি এখানে আলো প্রতিফলিতও হয় না।

এই বস্তুটি সরাসরি দেখা না গেলেও টেলিস্কোপের সাহায্যে জানা সম্ভব এটা কোথায় ও কিভাবে রয়েছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন দূরবর্তী নক্ষত্রপুঞ্জ থেকে ছুটে আসা আলো বিশ্লেষণ করে এই ডার্ক ম্যাটার সম্পর্কে ধারণা করা পাওয়া যাবে।

হাবল স্পেস টেলিস্কোপও আকাশের খুব ছোট্ট একটি জায়গায়, মাত্র দুই বর্গ ডিগ্রি এলাকাজুড়ে, প্রথমবারের মতো এই কাজটা করে আলোচিত হয়েছিল। এখন ইউক্লিড টেলিস্কোপ এই কাজটা করবে আকাশের ১৫ হাজার স্কয়ার ডিগ্রি এলাকাজুড়ে।

এই কাজটি টেলিস্কোপের যে ভিআইএস ক্যামেরা দিয়ে করা হবে সেটা যুক্তরাজ্যের নেতৃত্বে তৈরি করা হয়েছে।

“এই ক্যামেরা যে ছবি তুলবে সেটা হবে বিশাল,” বলেন ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের মহাকাশ গবেষণা ল্যাবরেটরির অধ্যাপক মার্ক ক্রপার।

তিনি বলেন, “মাত্র একটি ছবি দেখতেই আপনার ৩০০টির বেশি হাই-ডেফিনিশন টেলিভিশনের প্রয়োজন হবে।”আরো পড়ুন:আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনকে যেভাবে ধ্বংস করার পরিকল্পনা হচ্ছে৬ মে ২০২৩

ছবির উৎস,CEAছবির ক্যাপশান,বিশালাকৃতির এই ভিআইএস ক্যামেরা মহাকাশে পাঠানো হয়েছে

অন্যদিকে ডার্ক এনার্জি ডার্ক ম্যাটার থেকে একেবারেই আলাদা একটি বিষয়। ডার্ক এনার্জির কারণে গ্যালাক্সিগুলো আলাদা আলাদা অবস্থান করছে এবং এই শক্তি গ্যালাক্সিগুলোকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে যার ফলে মহাবিশ্বের জন্মের পর থেকে এটি আরো সম্প্রসারিত হচ্ছে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, ডার্ক এনার্জি হচ্ছে একটি রহস্যময় “শক্তি” যা এই মহাবিশ্বের বিস্তারকে ত্বরান্বিত করছে বলে ধারণা করা হয়। এর অস্তিত্ব ও প্রভাব প্রমাণ করে তিনজন বিজ্ঞানী ১৯৯৮ সালে নোবেল পুরস্কার জয় করেছেন।

মহাবিশ্বে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ছায়াপথগুলোর ত্রি-মাত্রিক ছবি বিশ্লেষণের মাধ্যমে ইউক্লিড টেলিস্কোপ ডার্ক এনার্জির বিষয়ে জানার চেষ্টা করবে- বলছেন বিজ্ঞানীরা।

বিজ্ঞানীরা বলছেন মহাজগতের বিভিন্ন বস্তুর মধ্যবর্তী স্থানে যে মহাশূন্যতা বিরাজ করছে তার ধরন বিশ্লেষণ করে পরিমাপ করার চেষ্টা করা হবে কতো সময়ের মধ্যে এগুলোর বিস্তার ঘটেছে।

তারা বলছেন এসব বস্তুকে দূরত্বের মাপকাঠি বা ‘ইয়ার্ডস্টিক’ হিসেবে ব্যবহার করা হবে।

এবিষয়েও এর আগে খুব অল্প পরিসরে কিছু গবেষণা হয়েছে।

তবে ইউক্লিড যে জরিপ চালাবে তাতে প্রায় ২০০ কোটি ছায়াপথের অবস্থান নিখুঁতভাবে জানার চেষ্টা করা হবে। এসব নক্ষত্রপুঞ্জের অবস্থান এই পৃথিবী থেকে প্রায় ১০০০ কোটি আলোক-বর্ষ দূরে।

“তখনই আমরা কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারবো,” বলেন সারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বব নিচোল।

“মহাবিশ্বের সবখানেই কি একই গতিতে সম্প্রসারণ ঘটছে? আজকের দিনে আমরা যা কিছুই পরিমাপ করি তার একটি গড় করা হয়ে থাকে। কিন্তু এখানে সম্প্রসারণের যে গতি, সেখানেও যদি সম্প্রসারণে গতি এক না হয় তাহলে কী হবে? বিজ্ঞানের এই বিষয়টাই এখন আবিষ্কৃত হবে,” বিবিসিকে বলেন তিনি।বিবিসি বাংলায় অন্যান্য খবর:জেনিনের শরণার্থী ক্যাম্পে ইসরায়েলি হামলায় আট ফিলিস্তিনি নিহত৩ জুলাই ২০২৩

ছবির উৎস, NASA/ESA/CSA/STSCIছবির ক্যাপশান, জন্মের পর থেকেই মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ ঘটছে

বিজ্ঞানীরা বলছেন ইউক্লিড টেলিস্কোপ নিশ্চিত করে বলতে পারবে না যে “এটাই ডার্ক ম্যাটার এবং এটাই ডার্ক এনার্জি।” তবে এই দুটো বিষয়ে বর্তমানে যেসব ধারণা ও চিন্তা রয়েছে সেগুলোর পরিসর আরো ছোট করে আনতে পারবে এই টেলিস্কোপ। এটি বিভিন্ন তাত্ত্বিক ও গবেষকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হবে।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায় যে বর্তমানে যেসব পার্টিকেল ডার্ক ম্যাটারের প্রতিনিধিত্ব করে সেগুলোকে চিহ্নিত করার বিষয়ে এই টেলিস্কোপ নতুন চিন্তার জন্ম দিতে পারে। তবে এখনও পর্যন্ত এবিষয়ে যতো অনুসন্ধান চালানো হয়েছে সেগুলোতে কোনো ফল পাওয়া যায়নি।

ডার্ক এনার্জির ব্যাপারেও ইউক্লিড টেলিস্কোপ বিজ্ঞানীদের নতুন সূত্রের সন্ধান দিতে পারে। বলা হচ্ছে এই গবেষণা থেকে অজানা এই শক্তি সম্পর্কে আরো কিছু ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে।

“একটা সম্ভাবনা হলো- ডার্ক এনার্জি হচ্ছে আসলে পঞ্চম এক শক্তি, মহাবিশ্বের নতুন এক শক্তি যা শুধুমাত্র ব্যাপক মাত্রায় কাজ করে, ফলে পৃথিবীতে জীবনের ওপর এর কোনো প্রভাব নেই,” বলেন ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা এসোর একজন বিজ্ঞানী অধ্যাপক মার্ক ম্যাকরকেন।

“তবে অবশ্যই এটি আমাদের মহাবিশ্বের ভবিষ্যতের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে- যেমন এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড কতো দূর পর্যন্ত বিস্তৃত হবে? এটা কি চিরকাল ধরে সম্প্রসারিত হতেই থাকবে? বড় থেকে আরো বড় হবে? নাকি এটা আবার একসময় ধসে গিয়ে আগের অবস্থায় ফিরে যাবে,” বলেন তিনি।

মহাকাশের রহস্য সংকেত


দূর কোনও গ্রহমণ্ডল থেকে ভেসে আসছে রহস্যময় সংকেত। কানাডার একটি টেলিস্কোপে ধরা পড়েছে সেই মিলিসেকেন্ডের রেডিও বার্তা। সেই বার্তা ঠিক কী ধরনের বা ঠিক কোথা থেকে আসছে তা জানা সম্ভব হয়নি।

এফআইবি নামে পরিচিত ১৩টি দ্রুত রেডিও সংকেতের এই সংকেতটি বারবার আসছে। তা আসছে পনেরো কোটি আলোকবর্ষ দূর থেকে। এর আগেও আরেকটি টেলিস্কোপে এমন সংকেত ধরা পড়েছিল।

জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এখন এই মহাকাশ রহস্য উন্মোচনে ব্যস্ত। ব্রিটিশ কলম্বিয়ার চাইম পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে চারটি ১শ মিটার লম্বা টেলিস্কোপ আছে, যা দিয়ে পুরো উত্তর আকাশ প্রতিদিন পর্যবক্ষণ করা হয়। এখানেই ১৩টি রেডিও সিগন্যাল পাওয়া গেছে। এই দ্রুতগতির রেডিও সংকেতগুলো ৭শ মেগাওয়াটের। আবার কানাডায় রেকর্ড করা কিছু সংকেত ৪শ মেগাওয়াটেরও।

এখনও পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা ৬০টি দ্রুতগতির রেডিও সংকেত পেয়েছেন। তার মধ্যে দুটি বারবার এসেছে। এক দলের ধারণা, হয়তো খুব বেশি চৌম্বক শক্তি সম্পন্ন একটি নিউট্রন তারা দ্রুগতিতে ঘুরছে অথবা দুটি নিউট্রন তারা একে অপরের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে।

মহাবিশ্বে সবচেয়ে শক্তিশালী বিস্ফোরণের রহস্য জানতে স্যাটেলাইট পাঠিয়েছে চীন

মহাবিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী বিস্ফোরণের রহস্য জানতে যৌথভাবে স্যাটেলাইট বা কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠিয়েছে চীন ও ফ্রান্স।
স্যাটেলাইটফাইল ছবি, রয়টার্স

মহাবিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী বিস্ফোরণের রহস্য জানতে যৌথভাবে স্যাটেলাইট বা কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠিয়েছে চীন ও ফ্রান্স। গত শনিবার চীনের জিচ্যাংয়ে অবস্থিত মহাকাশ ঘাঁটি থেকে ‘লং মার্চ ২-সি’ নামের রকেটের মাধ্যমে ‘স্পেস ভ্যারিয়েবল অবজেক্ট মনিটর’ স্যাটেলাইটটি উৎক্ষেপণ করা হয়। চীন ও ফ্রান্সের বিজ্ঞানীদের তৈরি স্যাটেলাইটটিতে চারটি যন্ত্র আছে। পৃথিবী থেকে ৬২৫ কিলোমিটার ওপরের কক্ষপথে অবস্থান করা ৯৩০ কিলোগ্রাম ওজনের স্যাটেলাইটটির মাধ্যমে মহাবিশ্বে গামা রশ্মি বিস্ফোরণের কেন্দ্রের তথ্য খুঁজে পাওয়া যাবে বলে ধারণা করছেন বিজ্ঞানীরা। সাধারণত বিশাল নক্ষত্র বিস্ফোরণের পরে গামা রশ্মির বিস্ফোরণ ঘটে। এসব বিস্ফোরণ সূর্যের চেয়ে ২০ গুণের বেশি শক্তিশালী হয়। বিস্ফোরণের কারণে উজ্জ্বল মহাজাগতিক আলো তৈরি হয়, যা শত শত কোটি সূর্যের বিস্ফোরণের সমান। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের ফ্ল্যাটিরন ইনস্টিটিউটের সেন্টার ফর অ্যাস্ট্রোফিজিকসের জ্যোতিঃপদার্থবিদ ওরে গটলিব বলেন, বিস্ফোরণ থেকে আলো আমাদের কাছে পৌঁছাতে অনেক সময় নেয় বলে পুরো বিষয়টিকে সময়ের দিকে ফিরে তাকানোর মতো মনে হয়। বিভিন্ন রশ্মি মহাকাশের মধ্য দিয়ে আসার সময় গ্যাস ও ছায়াপথের চিহ্ন বহন করে। মহাবিশ্বের ইতিহাস ও বিবর্তনকে আরও ভালোভাবে বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করবে নতুন স্যাটেলাইটটি।

বিজ্ঞানীদের তথ্যমতে, নতুন স্যাটেলাইটের মাধ্যমে বেশ কয়েকটি রহস্য উন্মোচন করার সম্ভাবনা রয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে মহাবিশ্বের সবচেয়ে দূরবর্তী গামা রে বার্স্ট বা জিআরবি বিস্ফোরণ। আজ পর্যন্ত শনাক্ত করা সবচেয়ে দূরবর্তী বিস্ফোরণটি বিগ ব্যাংয়ের ৬৩ কোটি বছর পর হয়েছিল। সেই সময়ে মহাবিশ্ব তার শৈশবকালে অবস্থান করছিল।

ফ্রান্সের প্যারিস ইনস্টিটিউট অব অ্যাস্ট্রোফিজিকসের জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফ্রেডেরিক ডাইগনে বলেন, ‘আমরা নিজেদের স্বার্থে গামা-রশ্মি বিস্ফোরণের রহস্য জানতে আগ্রহী। এসব বিস্ফোরণের তথ্য আমাদেরকে নক্ষত্রের মৃত্যুকে আরও ভালোভাবে বুঝতে সাহায্য করবে। স্যাটেলাইটের তথ্য বিশ্লেষণ করে অসম্ভব সব ঘটনা বিশ্লেষণ করতে পারি আমরা। নতুন কৃত্রিম উপগ্রহটি ফ্রান্স ও চীনের মহাকাশ সংস্থা যৌথভাবে পাঠিয়েছে। পশ্চিমা দেশের সঙ্গে চীনের মহাকাশবিষয়ক সহযোগিতা বেশ অস্বাভাবিক বলা হচ্ছে।’
২০২৩ সালে মহাকাশে মানুষের চমকপ্রদ যত কর্মকাণ্ড
বেন্নু নামে গ্রহাণু থেকে নমুনা সংগ্রহ করছে নাসার অসিরিস-রেক্স ক্যাপসুল। ছবি: নাসা

বিজ্ঞান এবং মহাকাশ ভ্রমণের জগতে ২০২৩ সালে ঘটেছে কিছু অভূতপূর্ব ঘটনা। ঘটনাগুলো যেন বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর উপন্যাস থেকে উঠে এসেছে।

দেখে নেওয়া যাক ২০২৩ সালের মহাকাশের সবচেয়ে নজরকাড়া কয়েকটি মুহূর্ত।
অ্যাক্সিয়ম-২ মিশনে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন ভ্রমণে যাওয়া চারজন। ছবি: অ্যাক্সিয়ম স্পেস

মহাকাশে পর্যটন

শখের তোলা আশি টাকা। তবে আপনার শখ যদি হয় মহাকাশ ভ্রমণ? সামর্থ্য থাকলেও সেটি পূরণ করা কয়েক বছর আগেও ছিল অসম্ভব।

কিন্তু আমরা এখন এমন এক যুগে প্রবেশ করেছি, যেখানে কারও সামর্থ্য থাকলেই তিনি মহাকাশে ভ্রমণ করতে পারবেন। মূলত ২০২৩ সালের মে থেকে অ্যাক্সিয়ম-২ এর হাত ধরে মহাকাশ পর্যটন শুরু হয়। সেবার নাসার প্রাক্তন মহাকাশচারী পেগি হুইটসন এবং তিনজন গ্রাহক আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে ভ্রমণ করেন। তবে অনুরূপ ভ্রমণের জন্য প্রতি আসনের জন্য খরচ পড়বে ৫৫ মিলিয়ন ডলার।অন্যদিকে, ব্রিটিশ ধনকুবের রিচার্ড ব্র্যানসন মহাকাশ পর্যটনের জন্য ভার্জিন গ্যালাকটিক নামে আরেকটি উদ্যোগ চালু করেছেন। ২০২৩ সালে ভার্জিন গ্যালাকটিক সাব-অরবিটাল রকেট-চালিত মহাকাশ বিমানের মাধ্যমে মহাকাশের প্রান্তে ছয়টি ভ্রমণ করেছে। এখানে প্রতি আসনের জন্য যাত্রীদের খরচ করতে হয়েছে ৪ লাখ ৫০ হাজার ডলার।

এদিকে, জেফ বেজোসের মহাকাশ পর্যটন সংস্থা ব্লু অরিজিনও ২০২৩ সালে তাদের সাব-অরবিটাল রকেট সফলভাবে উৎক্ষেপণ করেছে।
আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে জন্মানো সবজি নিয়ে কাজ করছেন নাসার মহাকাশচারী ফ্রাঙ্ক রুবিও। ছবি: নাসা মহাকাশে নভোচারীর এক বছর

নাসার মহাকাশচারী ফ্রাঙ্ক রুবিও'র আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে ছয় মাস কাটানোর কথা ছিল। কক্ষপথে যাতায়াতের জন্য তিনি রাশিয়ান সয়ুজ মহাকাশযানে ছিলেন। তবে মহাকাশযানটির একটি কুল্যান্ট ফুটো হয়ে গেলে রাশিয়াকে আরেকটি যান পাঠাতে হয়। যার কারণে রুবিও'র ফিরে আসতে ছয় মাস বিলম্বিত হয়। ৩৭১ দিন মহাকাশে কাটানোর পর অবশেষে সেপ্টেম্বরে পৃথিবীতে পা রাখেন তিনি। যা তাকে এনে দেয় মার্কিন নভোচারীদের মধ্যে মহাকাশে একটানা সর্বোচ্চ সময় কাটানোর রেকর্ড।

তবে রুবিওকে নিয়ে একটি হালকা কেলেঙ্কারির ঘটনাও ঘটে গেছে। কক্ষপথে জন্মানো প্রথম টমেটোগুলোর মধ্যে একটি হারিয়ে গেলে, তিনি সেটি ছিঁড়ে খেয়ে ফেলেছিলেন বলে অনেকে সন্দেহ করেন। মূল্যবান এই সম্পদটি যদিও পরবর্তীতে খুঁজে পাওয়া গেছে। তখন অবশ্য তাকে এ অভিযোগ অব্যাহতি দেওয়া হয়।
স্পেসএক্সের সবচেয়ে শক্তিশালী মার্স রকেট উৎক্ষেপণ। ছবি: এএফপি

স্পেসএক্সের মার্স রকেট বিস্ফোরণ

এ বছর এখন পর্যন্ত নির্মিত বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী রকেট উৎক্ষেপণ করেছে স্পেসএক্স। তবে দুই বারের প্রচেষ্টা বিফলে গেছে এবং রকেটগুলো বিস্ফোরিত হয়েছে।

প্রথমবারের মতো মঙ্গল গ্রহে মানুষ নেওয়ার জন্য স্টারশিপ নামে একটি রকেট এবং মহাকাশযান সিস্টেম চালু করেছে স্পেসএক্স। এপ্রিলে প্রথম প্রচেষ্টায় রকেটটি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে শুরু করলে স্পেসএক্স এটিকে ধ্বংস করতে বাধ্য হয়। নভেম্বরে দ্বিতীয় প্রয়াসে যানটি আরও অনেক দূর পর্যন্ত গিয়েছিল। কিন্তু মহাকাশযান ও রকেট বুস্টার উভয়ই শেষ পর্যন্ত বিস্ফোরিত হয়।

তবে পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণের দুর্ঘটনাগুলো যে স্পেসএক্সের জন্য বড় ধরনের কোনো বিপত্তি নিয়ে এসেছে এমনটি নয়। কেননা প্রতিষ্ঠানটি রকেট উন্নয়নের প্রাথমিক পর্যায়ে এরকম ব্যর্থতা আলিঙ্গনের জন্য আগে থেকেই পরিচিত।

২০২৫ সালের মধ্যে স্পেসএক্স নাসার জন্য চাঁদে মহাকাশচারী পাঠানোর লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। পাশাপাশি, ইলন মাস্ক আশা করছেন ২০২৯ সালের মধ্যে মানুষকে মঙ্গলে পৌঁছে দেবে স্টারশিপ।
চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে অবতরণকারী ভারতের চন্দ্রযান-৩। ছবি: নাসা

চাঁদে অবতরণের নতুন প্রতিযোগিতা

চাঁদে অবতরণ নিয়ে আবার নতুন প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। তবে এবারের অংশগ্রহণকারীরা সবাই রোবট।

প্রতিযোগিতাটি এপ্রিলে শুরু হয়, যখন আইস্পেস নামে জাপানের এক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান তাদের প্রথম বাণিজ্যিক যান হাকুটো-আর ল্যান্ডার-কে চাঁদে অবতরণের চেষ্টা করে। যদিও শেষ পর্যন্ত অবতরণে সময় সেটি ধ্বংস হয়ে যায়। রাশিয়ার স্পেস এজেন্সিও (রসকসমস) আগস্টে তাদের লুনা-২৫ মিশনটি সফল করতে ব্যর্থ হয়।

তবে এর কিছুদিন পরই ২৩ আগস্ট ভারতের মহাকাশ সংস্থা (ইসরো) চন্দ্রযান-৩ সফলভাবে চাঁদে অবতরণ করায়। চাঁদে মহাকাশযান সফলভাবে অবতরণের ক্ষেত্রে ভারত চতুর্থ দেশ। তবে চাঁদের দক্ষিণ মেরু অঞ্চলে অবতরণকারী হিসেবে প্রথম দেশ হয়ে উঠে ভারত।

অপরদিকে, জাপান অ্যারোস্পেস এক্সপ্লোরেশন এজেন্সিও চাঁদে অবতরণের উদ্দেশ্যে একটি মহাকাশযান পাঠিয়েছে। যা আগামী বছরের শুরুর দিকে অবতরণ করবে।
মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের প্রকাশ করা ভিডিওতে আন আইডেন্টিফায়েড ফ্লাইং অবজেক্ট (ইউএফও)। ছবি: পেন্টাগন

নাসা প্রকাশিত প্রথম ইউএফও রিপোর্ট

অজ্ঞাত অস্বাভাবিক ঘটনা অধ্যয়নের জন্য নাসা একটি বিশেষজ্ঞের দল গঠন করে বেশ সাড়া ফেলে দিয়েছে। দলটি মূলত আন-আইডেন্টিফায়েড ফ্লাইং অবজেক্ট (ইউএফও) নিয়ে অধ্যয়ন করছে। দলটি সেপ্টেম্বরে একটি প্রতিবেদনে তাদের প্রথম ফলাফল প্রকাশ করেছে।

দলটি জানায়, অনেক বিশ্বাসযোগ্য প্রত্যক্ষদর্শী এবং প্রায়শই সামরিক পাইলটরা আকাশে এমন সব বস্তু দেখেছেন, যেগুলো তারা চিনতে পারেননি। যদিও বেশিরভাগ ঘটনার রহস্য সমাধান হয়েছে। কিন্তু কিছু কিছু ঘটনা পরিচিত মানবসৃষ্ট বা প্রাকৃতিক ঘটনা হিসেবে সঙ্গে সঙ্গে চিহ্নিত করা যায়নি।

তবে ঘটনাগুলো কোনো বুদ্ধিমান এলিয়েন ঘটিয়েছে, এরকম কোনো শক্ত প্রমাণও দলটি এখন পর্যন্ত পায়নি।

আবার চাঁদে পা ফেলবে মানুষ

পাঁচ দশক পর চার মহাকাশচারী আবার চাঁদের বুকে পা ফেলবে বলে জানিয়েছে নাসা। ২০২৩ সালের এপ্রিলে তারা আর্টেমিস ২ মুন মিশনটি সম্পর্কে তথ্য প্রকাশ করে এবং নভোচারীদের বাছাই করে।

২০২৪ সালের নভেম্বরে এটি টেক-অফের জন্য প্রস্তুত হবে বলে জানানো হয়। বলা হচ্ছে, এই যাত্রার পরের গন্তব্য হবে মঙ্গল গ্রহ। আর্টেমিস ২ মিশনের একটি লক্ষ্য হচ্ছে, চাঁদে একটি স্থায়ী ফাঁড়ি স্থাপন। যেখানে মহাকাশচারীরা থাকতে এবং কাজ করতে পারবেন। যা একসময় মঙ্গল গ্রহের মিশনগুলোর পথ প্রশস্ত করবে।
উটাহ মরুভূমিতে অবতরণ করা নাসার অসিরিস-রেক্স ক্যাপসুল। ছবি: নাসা

অসিরিস-রেক্সের বিশেষ ডেলিভারি

২০২৩ সালে একটি মহাকাশযান পৃথিবীতে মহাকাশ থেকে গ্রহাণুর টুকরো নিয়ে আসে। যাতে থাকতে পারে সৌরজগতের লুকিয়ে থাকা চমকপ্রদ সব তথ্য।

নাসার অসিরিস-রেক্স ক্যাপসুল মহাকাশের গ্রহাণু থেকে পাথর, ধূলিকণাসহ বিভিন্ন নমুনা সংগ্রহ করে থাকে। ২০২০ সালে বেন্নু নামক গ্রহাণু থেকে সফলভাবে একটি নমুনা সংগ্রহ করে ক্যাপসুলটি।

গত ২৪ সেপ্টেম্বর ক্যাপসুলটি উটাহ মরুভূমিতে অবতরণ করে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের একটি মহাজাগতিক ধাঁধায় ফেলে দেয়। ক্যাপসুলটির নিয়ে আসা সম্পদগুলো বিজ্ঞানীদের ধারণার বাইরে ছিল।

প্রাথমিক বিশ্লেষণে জানা যায়, ক্যাপসুলটির আনা শিলা এবং ধূলিকণাগুলোতে পানি এবং প্রচুর পরিমাণে কার্বন রয়েছে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, পৃথিবীতে জীবন সৃষ্টির পেছনে গ্রহাণুগুলোর অবদান থাকতে পারে। এর বাইরেও নতুন অনেক তথ্য নিয়ে হাজির হয়েছে এই ক্যাপসুলটি। বিজ্ঞানীরা যেগুলো পরীক্ষা করে দেখছেন।

পরিশেষে, মহাকাশ অনুসন্ধানে নাসা এবং মার্কিন সরকারের বাইরেও ভারত এবং চীনের মতো দেশগুলো থেকেও বিভিন্ন প্রচেষ্টা দেখা যাচ্ছে। এ ছাড়া, বিশ্বজুড়ে ব্যক্তিগত খাত থেকেও এই ক্ষেত্রে ব্যাপক বিনিয়োগ হচ্ছে। যার কারণে আমাদের সামনে আসছে আশ্চর্যজনক সব আবিষ্কার।

মহাকাশ গবেষণা গত কয়েক দশকে অভূতপূর্ব অগ্রগতি অর্জন করেছে, যা মানবজাতিকে মহাবিশ্ব সম্পর্কে আরও জানতে অনুপ্রাণিত করেছে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ